মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া) নির্বাচনী এলাকা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে সর্বদা স্মরণ করবে এক নেতাকে, যিনি শুধু রাজনীতিতে নয়, মুক্তিযুদ্ধ, আইন ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার, এবং সমাজসেবায়ও অম্লান ছাপ রেখেছেন। তিনি ছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু — একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বর্ষীয়ান আইনজীবী, সফল সংসদ সদস্য, এবং সাবলীল মন্ত্রী।
কুমিল্লা-৫-এর মানুষ তাঁকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই দেখেননি; তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, যিনি স্থানীয় মানুষের কল্যাণ, সামাজিক ন্যায় এবং উন্নয়নের পথে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল দেশপ্রেম, ন্যায়বিচার এবং জনগণের প্রতি অটুট দায়িত্ববোধ।
রাজনৈতিক জীবন: জনগণের নেতা ও সংসদের অভিজ্ঞ সদস্য -আব্দুল মতিন খসরু কুমিল্লা-৫ আসন থেকে মোট পাঁচবার (১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮) জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা শুধুই সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তার নেতৃত্বে এলাকা ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সামাজিক সংহতি লাভ করে।
১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই মেয়াদে তার নেতৃত্বে আইন ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার মামলার বিচারের পথে বাধা সৃষ্টিকারী ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিলকরণে তার অগ্রণী ভূমিকা, যা দেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।
তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব পদে থাকাকালীন সময়ে তিনি আইন ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন এবং নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের জন্য অনুপ্রেরণার পথ তৈরি করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: বীরত্ব ও সাহসের প্রতীক -১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আব্দুল মতিন খসরু সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কুমিল্লার অবিভক্ত বুড়িচং থানার মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন কঠিন পরিস্থিতিতে তার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সাহস, আত্মত্যাগ এবং সততা দেখিয়েছেন, যা এলাকার মানুষদের মনে চিরকালীন কৃতজ্ঞতার স্মৃতি রেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার নিষ্ঠা শুধু যুদ্ধকালীন সময়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দেশের মুক্তি, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার মূল্য সংরক্ষণের জন্য অবিচল ছিলেন। কুমিল্লা-৫-এর মানুষ তাকে একজন বীর, পথপ্রদর্শক এবং আদর্শিক নেতা হিসেবে মনে রাখে।
শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবন: জ্ঞান, নীতি ও ন্যায়ের প্রতীক -অ্যাডভোকেট খসরু ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ সালে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মিরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় বিদ্যালয়ে, পরে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক এবং কুমিল্লা ল’ কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে তার অর্জিত জ্ঞান এবং ন্যায়বিচারের প্রতি গভীর আগ্রহ পরবর্তীতে রাজনীতি ও আইনজীবী জীবনের মূল শক্তি হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সংযমী, নম্র এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল। রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি স্থানীয় সমাজ ও পরিবারে এক শান্ত ও সমন্বয়ক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মৃত্যু ও সমাপনী মূল্যায়ন -করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ এপ্রিল ২০২১ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার প্রয়াণ কেবল কুমিল্লা-৫ এলাকা নয়, দেশের রাজনীতিতেও একটি শূন্যতা তৈরি করেছে। এই আসনে সংসদীয় কার্যক্রম এবং নির্বাচনী সমীকরণ পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রার্থীদের আগ্রহ এবং কার্যক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তার জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় যে নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, জনগণের পাশে দাঁড়ানো, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগ করা। কুমিল্লা-৫-এর মানুষ তার স্মৃতিকে চিরকাল ধরে রাখবে। তার অবদান, সাহস, এবং নৈতিক মানদণ্ড নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস।
আব্দুল মতিন খসরু ছিলেন শুধুই একজন নেতা নয়। তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী, পথপ্রদর্শক এবং জনগণের অভিভাবক, যার জীবন ও সংগ্রাম দেশের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় থাকবে।