মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার 

বাংলাদেশের গ্রামবাংলায় শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাস লিখতে গেলে অনেক নামই আসবে। কিন্তু কিছু নাম থাকে আলাদা—যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা বিপুল পারিবারিক ঐশ্বর্য ছাড়াই কেবল নিজের শ্রম ও দৃঢ় সংকল্পের ওপর দাঁড়িয়ে সমাজে পরিবর্তনের বীজ বপন করেন। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের সন্তান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী তেমনই এক প্রেরণাদায়ী নাম।

তার জীবনকাহিনি কেবল একজন প্রবাসীর অর্থ উপার্জনের গল্প নয়; এটি এক মানুষের আত্মত্যাগ, দায়বদ্ধতা এবং শিক্ষাকেন্দ্রিক সামাজিক বিপ্লবের দলিল।

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারিয়ে ছোট্ট বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। যে বয়সে একটি শিশুর স্কুলব্যাগ আর খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই তিনি বুঝে যান জীবন মানে সংগ্রাম। অভাব-অনটন, অনিশ্চয়তা ও দায়িত্ববোধ তার চরিত্রকে শাণিত করে।

১৯৮২ সালে জীবিকার তাগিদে তিনি পাড়ি জমান কাতারে। নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কঠোর পরিশ্রমে কাটে তার প্রবাসজীবনের প্রথম অধ্যায়। প্রচণ্ড গরম, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা—সবকিছুর মাঝেও তিনি ভুলে যাননি নিজের গ্রামের কথা। তার স্বপ্ন ছিল—একদিন নিজের এলাকায় শিক্ষার আলো জ্বালাবেন।

চার বছর পর দেশে ফিরে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়’। বাবার স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে গড়া এই প্রতিষ্ঠান আজ এমপিওভুক্ত এবং প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করছে।

একটি বিদ্যালয় মানে কেবল পাঠদান নয়; এটি একটি এলাকার সামাজিক রূপান্তরের কেন্দ্র। বিদ্যালয় ঘিরে তৈরি হয় সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সংস্কৃতি। ধান্যদৌল ও আশপাশের গ্রামের বহু শিক্ষার্থী আজ এই বিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করে উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে—যা এক সময় কল্পনাতীত ছিল।

১৯৮৯ সালেই তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৯২ সাল থেকে ট্যাক্সি চালিয়ে উপার্জিত অর্থের বড় অংশ ব্যয় করতে থাকেন নিজ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠনে। ব্যস্ত নগরজীবনে দিনরাত পরিশ্রম করেও তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নিজ গ্রাম।

একজন প্রবাসী যখন নিজের আরাম-আয়েশ কমিয়ে গ্রামের স্কুল-কলেজে বিনিয়োগ করেন, তখন তা নিছক দান নয়—এটি দায়িত্ববোধের গভীর প্রকাশ।

আজ তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছয়টি—দুটি কলেজ,দুটি মাদরাসা,একটি উচ্চ বিদ্যালয়,একটি কিন্ডারগার্টেন

এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের আর দূরদূরান্তে যেতে হচ্ছে না। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।

শুধু প্রতিষ্ঠান গড়েই তিনি থেমে থাকেননি। এলাকায় দুটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। একটি সমাজে পাঠাগার মানে জ্ঞানের উন্মুক্ত দরজা। বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হলে প্রজন্মের চিন্তাশক্তি বিকশিত হয়—এ বিশ্বাস থেকেই তার এই উদ্যোগ।

নিজের নামে ফাউন্ডেশন গড়ে ২০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিয়েছেন। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এই সহায়তা অনেক সময় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া ১০টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন তিনি। একটি ঘর মানে শুধু ইট-সিমেন্ট নয়—এটি নিরাপত্তা, সম্মান ও নতুন করে বাঁচার সাহস।

গ্রামাঞ্চলে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা সুবিধা সীমিত। এই বাস্তবতা অনুধাবন করে তিনি একটি ডায়াবেটিক হাসপাতালের জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের জমি দান করেন। এটি ভবিষ্যতে হাজারো রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার পথ সুগম করবে।

২০০৭ সালে ধান্যদৌল কালীমন্দির প্রাঙ্গণের শতবর্ষী বটগাছ রক্ষায় এক লাখ টাকা দিয়ে সেটি কিনে মন্দির কর্তৃপক্ষকে দান করেন। এটি কেবল একটি গাছ রক্ষা নয়—এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দৃষ্টান্ত।

একজন মুসলিম দাতার পক্ষ থেকে একটি মন্দিরের ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসা প্রমাণ করে—তার মানবিকতা ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার জায়গায় পৌঁছেছে।

অর্থ-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিজীবনে তিনি সাদামাটা। এখনো প্রবাসে থাকেন, কাজ করেন, এবং উপার্জনের বড় অংশ ব্যয় করেন শিক্ষাবিস্তার ও সমাজকল্যাণে। তার জীবনের মূল দর্শন—শিক্ষা হলো টেকসই উন্নয়নের একমাত্র শক্ত ভিত্তি।

আজ যখন সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাফল্যের গল্প বেশি শোনা যায়, তখন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন আমাদের ভিন্ন এক পাঠ শেখায়। তিনি দেখিয়েছেন—একজন নির্মাণশ্রমিক কিংবা ট্যাক্সিচালকও চাইলে একটি অঞ্চলের শিক্ষার মানচিত্র বদলে দিতে পারেন।

তার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
প্রবাসের আয় শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়, দেশের মাটিতে ভবিষ্যৎ গড়ার জন্যও ব্যবহার করা যায়।
দায়িত্ববোধ থাকলে ছোট গ্রামও বড় স্বপ্ন দেখতে পারে।
এবং একজন মানুষের আন্তরিক উদ্যোগ একটি প্রজন্মের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী কেবল একজন শিক্ষানুরাগী নন; তিনি প্রমাণ করেছেন—স্বপ্ন যদি সমাজকেন্দ্রিক হয়, তবে সেটিই হয়ে ওঠে প্রকৃত উন্নয়নের আলোকবর্তিকা।