নিজস্ব প্রতিবেদকঃ স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও নির্ভুল ও সঠিক তথ্যভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তৈরি করতে পারেনি কোনো সরকার। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম সংখ্যা দেওয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। এ পর্যন্ত মোট আট বার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সংশোধন হয়েছে।
যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত করছেন, সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিনিয়তই এটা নিয়ে বিব্রত বোধ করেন।
অতীতে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার জন্য তদ্বির ও দৌড়ঝাঁপ করেন, দেওয়াও হয়। এসব সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে মানা হয়নি কোনো নিয়মকানুন। সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে যে-যার প্রয়োজনে ও সুবিধা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার গেজেট করান। মন্ত্রণালয়ও একেক সময় একেক পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন জারি করে। ফলে তালিকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে অনেক।
এক্ষেত্রে আমরা ইতিমধ্যে অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। প্রায় ৩ হাজার রিট মামলা রয়েছে তারমধ্যে কিছু মামলায় রায়ের অপেক্ষায় আছি।মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও তালিকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার ভুয়া অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।জাতির ইতিহাস তো অমুছনীয় থাকা উচিত।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, মুক্তিযোদ্ধা গেজেট, লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতীয় তালিকা থেকে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৭৬ জনের নাম বাতিল করা হয়েছে।জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা শনাক্তে ধারাবাহিকভাবে কাজ চলছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে অমুক্তিযোদ্ধা প্রমাণিত হলে তাদের নাম বাতিলসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হচ্ছে।
সুত্র বলছে,ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ভারতীয় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ৮৪২টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে তদন্ত শেষে ৪৮১ জনের নাম বাতিলের চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত মোট ৮৪২টি অমুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে নিবিড় তদন্ত শেষে ৪৮১ জনের গেজেট, লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতীয় তালিকা থেকে নাম বাতিলের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর জামুকার একটি উপকমিটি বিস্তারিত তদন্ত ও শুনানি পরিচালনা করে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার সনদ ও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করা হয়।
শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নয়, দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে অমুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে একই পদ্ধতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তালিকা পুরোপুরি স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা অনেক আছে। যাচাই করে বাদ দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে অভিযোগ শুনানি অব্যাহত রাখা হয়েছে। নানা কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অভিযোগ শুনানিতে গতি আসেনি।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ৯০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার আবেদন পেয়ে হতাশ হয়েছি। গত প্রায় ১ বছর ধরে যাচাই-বাছাই চলেছে। এখানেও রয়েছে আদালতে রুজু করা মামলা। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা কমে আসার পরিবর্তে দিনদিন বৃদ্ধি পাওয়াকে অস্বাভাবিক আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে,বিভিন্ন সুবিধা, মাসিক ভাতাসহ এলাকায় প্রভাব খাটাতেই বিভিন্ন পন্থায় অনেকে বাগিয়ে নিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সনদ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে তালিকায় নতুন নতুন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে। ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে যারা শহিদ হয়েছেন এবং যারা জীবিত মুক্তিযোদ্ধা আছেন, ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তাদের সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার। দেখা যাচ্ছে,গত ৩০ বছরে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার নতুন মুক্তিযোদ্ধা যুক্ত হয়ে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৫০ জনে। অথচ ৩০ বছর পর এসে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমার কথা ছিল।