মোঃ শাহজাহান বাশার, স্টাফ রিপোর্টার
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামে ঢুকলেই আজ চোখে পড়ে শিক্ষার এক বিস্ময়কর জাগরণ। উঁচু ভবনের কলেজ, সুসজ্জিত উচ্চ বিদ্যালয়, মাদরাসা, কিন্ডারগার্টেন, পাঠাগার—সব মিলিয়ে যেন এক ক্ষুদ্র শিক্ষানগরী। অথচ একসময় এই এলাকায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও ছিল না। দারিদ্র্য, অবহেলা আর সুযোগের অভাবে অনেক মেধা হারিয়ে যেত অকালেই। সেই অন্ধকার ভেদ করে আলো জ্বালিয়েছেন একজন প্রবাসী—মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।
তাঁর জীবনের গল্প যেন সংগ্রাম, ত্যাগ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক জীবন্ত দলিল। কৈশোরেই বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। পিতা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ছিলেন একজন শিক্ষক। শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা তিনি পেয়েছিলেন রক্তের উত্তরাধিকারেই। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। এসএসসি পেরোতেই সংসারের ভার তাঁকে ঠেলে দেয় প্রবাসের পথে।
১৯৮২ সালে তিনি পাড়ি জমান কাতারে। কাজ জোটে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে। পাইলিংয়ের জন্য বিশাল শক্ত পাথর ভাঙতে হতো। হাতে ফোসকা, পায়ে আঘাত, অসহনীয় যন্ত্রণা—তবু থামেননি। কারণ দেশে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল মা আর পাঁচ ভাইবোন। পাথরের গায়ে হাতুড়ির ঘা যেমন পড়েছে, তেমনি তাঁর হৃদয়ে জমেছে স্বপ্নের দৃঢ়তা। তিনি বুঝেছিলেন, এই কষ্ট একদিন বদলে দেবে তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ।
চার বছর পর দেশে ফিরে কিছুটা স্বচ্ছলতা অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর মনে তখন বড় স্বপ্ন—নিজ গ্রামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। এলাকায় সভা-সমাবেশ হয়েছিল বহুবার, সবাই স্কুল চেয়েছিল, কিন্তু জমি দিতে কেউ এগিয়ে আসেননি। সেই সময় তরুণ মোশাররফ দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন—বিদেশে ঘাম ঝরিয়ে যা উপার্জন করেছি, তা দিয়ে স্কুলের জমি কিনব। তাঁর সেই ঘোষণা শুধু কথায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। জমি কেনা থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণ—সবই করেছেন নিজ উদ্যোগে। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। আজ সেখানে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে কর্মরত দুই ডজনের বেশি মানুষ।
একই বছর তিনি নতুন স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্কে শুরুতে নির্মাণশ্রমিক, পরে রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে ট্যাক্সি চালানোর অনুমতি পান। সেই থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন। অনেকেই প্রবাসে গিয়ে আরাম-আয়েশের জীবন গড়েন। কিন্তু মোশাররফ ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি বিলাসিতা নয়, বেছে নেন ত্যাগের জীবন।
তাঁর উপার্জনের বড় অংশই পাঠিয়েছেন গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও আব্দুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। এরপর একে একে গড়ে ওঠে আশেদা-জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদরাসা, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী হাফেজিয়া মাদরাসা এবং মুমু-রোহান কিন্ডারগার্টেন। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠা করেছেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী লাইব্রেরি ও ডা. মিজানুর রহমান চৌধুরী কিশোরী পাঠাগার। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজে স্নাতক পর্যায়ে দশটি বিষয় ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি বিষয় চালু রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। ফলাফলের দিক থেকেও প্রতিষ্ঠানটি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করেছে।
মানবিক দায়বদ্ধতায়ও তিনি অনন্য। ব্রাহ্মণপাড়ায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকার জমি দিয়েছেন। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য গড়েছেন বৃত্তি তহবিল; ইতোমধ্যে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছে। দশটি গৃহহীন পরিবারকে নির্মাণ করে দিয়েছেন বাসস্থান। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদ উন্নয়নেও রেখেছেন অবদান।
তাঁর মানবিকতার আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত শতবর্ষী এক বটগাছ রক্ষা করা। ধান্যদৌল গ্রামের শ্রীশ্রী কালীমন্দির প্রাঙ্গণের পুরোনো বটগাছটি বিক্রি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে বিদেশে বসেই তিনি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে সেটি কিনে নেন এবং মন্দিরকেই দান করেন। আজ সেই গাছ ছায়া দিচ্ছে গ্রামবাসীকে, বহন করছে ঐতিহ্যের স্মৃতি।
ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। কিন্তু প্রবাসে এখনো মেসে সাধারণভাবে থাকেন। আলুভর্তা, ডাল বা ডিম দিয়েই তিনবেলা চলে যায়। স্ত্রী-সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে না নেওয়ার কারণও স্পষ্ট—অতিরিক্ত খরচের বদলে সেই অর্থ তিনি ব্যয় করতে চান দেশের মানুষের জন্য। স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরীর ত্যাগ ও সমর্থনকে তিনি নিজের শক্তি বলে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে তাঁর বয়স ৬২ বছর। তরুণ বয়সে পড়াশোনায় ছেদ পড়লেও তিনি আবারও শিক্ষাজীবনে ফিরেছেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন। তাঁর বিশ্বাস—পড়াশোনার কোনো বয়স নেই।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন আমাদের শেখায়, প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়েও নিজের শিকড়কে ভুলে না গেলে বদলে দেওয়া যায় একটি জনপদের ভাগ্য। স্টিয়ারিং হাতে নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় চলতে চলতে তিনি আসলে চালনা করেছেন এক গ্রামের ভবিষ্যৎ। তাঁর ত্যাগ, নিষ্ঠা ও মানবিকতার আলোয় আজ ধান্যদৌল শুধু একটি গ্রাম নয়—এটি একটি স্বপ্নপূরণের ইতিহাস।
| আজকের তারিখঃ বঙ্গাব্দ