মো. শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি এক জটিল ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার নাম। প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন সব মিলিয়ে রাজনীতি আজ কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি হয়ে উঠেছে জনমানুষের প্রত্যাশা, অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা নয়। উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির দৃশ্যমান চিত্র যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ রাজনীতিকে এখন শুধু দলীয় পরিচয়ে নয়, বরং তাদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে।
বর্তমানে রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মেরুকরণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলেও তা যখন ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও সামাজিক বিভাজনে রূপ নেয়, তখন গণতন্ত্রের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। সংসদ, রাজপথ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গায় বিরোধিতার ভাষা অনেক সময় শালীনতার সীমা অতিক্রম করে। এতে গণতান্ত্রিক চর্চার বদলে সংঘাতের সংস্কৃতি তৈরি হয়।
একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের দায়িত্ব জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; বিরোধী দলের দায়িত্ব গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে বিকল্প চিন্তা ও প্রস্তাব তুলে ধরা। যদি এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র ও জনগণ।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্য, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ—এসব বিষয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। যখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
রাজনীতির স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। একইসঙ্গে সুশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি টেকসই হয় না। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কীভাবে উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত করা যায়
তরুণ প্রজন্ম এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের মতপ্রকাশের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। তারা শুধু স্লোগান নয়, যুক্তি ও তথ্য চায়। তারা কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের বাস্তব সুযোগ প্রত্যাশা করে।
রাজনীতির প্রতি তরুণদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। দলীয় আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
গণতন্ত্রে সংলাপের বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি না হলে সংকট দীর্ঘায়িত হয়। নির্বাচন, সাংবিধানিক সংস্কার, মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা—এসব ইস্যুতে সর্বদলীয় আলোচনার চর্চা জরুরি।
রাজনীতির মূল শক্তি হলো জনগণ। তাই জনগণের আস্থা হারালে কোনো রাজনৈতিক শক্তিই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আস্থার পুনর্গঠনই এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাদের সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ এনে দিয়েছে, তেমনি সুযোগও সৃষ্টি করেছে। বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে যদি অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়, তবে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে।
রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষমতা নয়, কল্যাণ। বিরোধ নয়, সমাধান। আর প্রতিপক্ষ নয়, সহযাত্রী ভাবনা।
গণতন্ত্র টিকে থাকে যখন ভিন্নমতকে সম্মান করা হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষিত হয়। এখন সময়—সংঘাতের ভাষা থেকে সংলাপের ভাষায় ফিরে আসার
মন্তব্য করুন