মোঃ শাহজাহান বাশার
আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন, যা বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বেলা ৩টায় শুরু হওয়া এ অধিবেশনে আগামী ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে বাজেট অধিবেশনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্য সোচ্চার ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে।
রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সংসদের পাশাপাশি পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির আমেজ কাটিয়ে পূর্বঘোষিত বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজপথেও সক্রিয় হচ্ছে ১১ দলীয় ঐক্য। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সীমান্তে পুশইন, ইসলামী ব্যাংকে বিতর্কিত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান নিয়োগসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু তাদের আন্দোলনের কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাবে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীসহ দেশের সব মহানগরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কর্মসূচি ঘোষণাকালে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি কোনো দলের কর্মসূচি নয়, বরং দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন। তিনি জানান, জনগণের পক্ষে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে সংসদে ও রাজপথে ভূমিকা পালন করবে জামায়াত।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য বিরোধী দলও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করছে। শনিবার রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে খেলাফত মজলিস এবং আজও একই দাবিতে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে গত ৩০ এপ্রিল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৬ মে রাজশাহীতে প্রথম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ১৩ জুন চট্টগ্রাম, ২০ জুন খুলনা, ২৭ জুন ময়মনসিংহ, ১১ জুলাই রংপুর, ১৮ জুলাই বরিশাল এবং ২৫ জুলাই সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার আয়োজন এবং অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনাও রয়েছে জোটটির।
অন্যদিকে সরকারি দলের সূত্র জানিয়েছে, বাজেট অধিবেশনেই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হতে পারে। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান পূর্ববর্তী অধিবেশনে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য বিরোধী দলকে পাঁচজন সদস্যের নাম জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিরোধী দল এখনো কোনো নাম প্রস্তাব করেনি। ফলে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই কমিটি গঠন করা হলে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী সংসদ সদস্যরা একাধিকবার ওয়াকআউটসহ সরব ভূমিকা পালন করেন। এবারও একই ইস্যুসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী সদস্যরা সক্রিয় থাকবেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচিত বিরোধীদলীয় নতুন ১৩ সদস্য সংসদীয় আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে মাঠে যেমন সক্রিয় রয়েছে জামায়াত, তেমনি সংসদেও তারা জোরালোভাবে কথা বলবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন, জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী দল অতীতের মতো ভবিষ্যতেও সোচ্চার থাকবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ জনগণের ভোগান্তির বিষয়গুলো সংসদে গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ জানিয়েছেন, ঈদের বিরতির পর বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচি নতুন উদ্যমে শুরু হবে এবং সাম্প্রতিক জাতীয় ইস্যুগুলোও এসব সমাবেশে গুরুত্ব পাবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একদিকে জাতীয় বাজেট উপস্থাপন, অন্যদিকে বিরোধী দলের আন্দোলন ও সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ সংসদ ও রাজপথ উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
মন্তব্য করুন