মোঃ শাহজাহান বাশার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় আজ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন একটি শব্দ—“সেবা”। কারণ জনগণ আজ নেতা নয়, সেবক চায়। এমন মানুষ চায়, যারা ক্ষমতার চেয়ারকে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম না ভেবে মানুষের কল্যাণের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে আজ এই প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
দেশের সাধারণ মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের চাপ, বেকারত্ব, চিকিৎসা সংকট, শিক্ষা বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব মানবিক কাজই মানুষের কাছে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে। জনগণ এখন বুঝতে শিখেছে—“ক্ষমতা মানুষের সেবা করার মাধ্যম, শাসন করার নয়।”
রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং উন্নয়নের সুফল সবার মাঝে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতি আজ ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছে। তারা এমন নেতৃত্ব চায়, যারা জনগণের পাশে দাঁড়াবে দুর্যোগে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে সাহসের সঙ্গে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকবে আপসহীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “একটি ভুল ভোট পাঁচ বছরের কষ্ট ডেকে আনতে পারে।” এই কথাটি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। একজন অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা জনগণবিচ্ছিন্ন প্রতিনিধি নির্বাচিত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ওপর। তাই সচেতন ভোটার তৈরি করাও এখন সময়ের দাবি।
সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করেন, “সমাজ বদলাতে হলে আগে মানুষকে বদলাতে হবে।” কেবল সরকার পরিবর্তন বা নতুন নেতৃত্ব আসলেই সমাজ বদলায় না; প্রয়োজন মানুষের মানসিক পরিবর্তন, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন—সব জায়গা থেকেই ইতিবাচক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো যুব সমাজের বিপথগামিতা। মাদক, সহিংসতা, অনলাইন অপরাধ ও হতাশা অনেক তরুণকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ এই যুবকরাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই এখন প্রয়োজন—“যুবকদের ধ্বংস নয়, নেতৃত্বের পথে আনতে হবে।” তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক উদ্যোগ ও নেতৃত্ব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে হবে।
রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রশ্নও আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “নৈতিকতা ছাড়া রাজনীতি কখনো কল্যাণ আনতে পারে না”—এই সত্যটি যত দ্রুত উপলব্ধি করা যাবে, তত দ্রুত সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কারণ দুর্নীতি, মিথ্যাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার কখনো জনগণের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও গ্রামে বসবাস করে। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ গ্রামীণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই “গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে”—এই দর্শনকে সামনে রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি সহায়তা, শিক্ষার সুযোগ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দিতে না পারলে উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যান মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে না।
একজন বৃদ্ধ কৃষক যখন হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে অসহায়ের মতো ফিরে আসেন, তখন বুঝতে হবে উন্নয়নের গল্পে কোথাও বড় ফাঁক রয়ে গেছে। শহরের উঁচু দালান আর বড় বড় প্রকল্প দিয়ে উন্নয়নের চিত্র আঁকা গেলেও সাধারণ মানুষের কষ্ট যদি কমে না, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ “সাংবাদিকতার কলম সমাজের আয়না।” একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্য ও মানুষের কষ্ট তুলে ধরেন সত্যের ভাষায়। গণমাধ্যম যদি নিরপেক্ষ ও মানবিক দায়িত্ব পালন করে, তবে সমাজ পরিবর্তনের পথ আরও শক্তিশালী হবে।
আজ সময় এসেছে ব্যক্তি পূজার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সেবামূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার। মানুষ এমন নেতৃত্ব চায়, যারা জনগণের দরজায় যাবে ভোটের আগে নয়, সবসময়। যারা বিলাসী রাজনীতি নয়, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখবে। কারণ নেতা অনেক আছে, কিন্তু প্রকৃত সেবক এখনো বিরল।
মন্তব্য করুন