শিরোনাম : মানবিক বিজিবি: টেকনাফে দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রীদের উদ্ধার, আহতদের হাসপাতালে প্রেরণ প্রবর্তক মোডে দেশবিরোধী অপপ্রচার ও শিষ্টাচারবহির্ভূত রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান কর্মসূচি পালন। ভাত ছাড়াই ১৩ বছর, সিংড়ার স্কুলছাত্র পারভেজের ব্যতিক্রমী জীবন ছাতকে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের 'ফোর্স মবিলাইজেশন ড্রিল' প্রস্তুতির মহড়া নারী কেলেঙ্কারি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির অভিযোগে কাটগড়ায় বিআইডব্লিউটিএ পরিচালক আরিফ হাসনাত টেকনাফ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি নুরুল হোসাইনের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশের ফোর্স মোবিলাইজেশন ড্রিল অনুষ্ঠিত ফরিদপুরে শিশুকে জোড় পূর্বক ধর্ষণ"এলাকাবাসী হাতে ধর্ষক আটক। রাণীশংকৈলে বীজ-সার বিতরণ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পাশে সরকার। ঠাকুরগাঁওয়ে ইয়াবাসহ নারী মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
ঢাকার বার্তা
প্রকাশ : Jun 19, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

অর্থসংকটে অনিশ্চয়তায় ভাঙা-বরিশাল-কুয়াকাটা রেলপথ প্রকল্প

মোঃ শাহজাহান বাশার

দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা বন্দরের সঙ্গে রাজধানীর আধুনিক রেল যোগাযোগ স্থাপন এবং পর্যটন নগরী কুয়াকাটাকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার বহুল আলোচিত ভাঙা-বরিশাল-কুয়াকাটা রেলপথ প্রকল্প অর্থায়নের সংকটে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ও বিস্তারিত নকশা (ডিটেইলড ডিজাইন) প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হলেও এখনো কোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী বা বড় বিনিয়োগকারীর অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় সম্ভাব্য জমি অধিগ্রহণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হাজারো পরিবার গত আট বছর ধরে চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে জীবনযাপন করছে। বাড়িঘর ও জমিতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দেওয়া লাল নম্বরের কারণে তারা জমি বিক্রি, নতুন স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পুরোনো বাড়িঘর সংস্কার করতে পারছেন না। অথচ এখনো ক্ষতিপূরণের কোনো অর্থও পাননি তারা।

রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ২১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি ফরিদপুরের ভাঙা থেকে শুরু হয়ে বরিশালের গৌরনদী, উজিরপুর, বরিশাল বিমানবন্দর, কাশীপুর, সাগরদী ও টিয়াখালী এলাকা অতিক্রম করবে। এরপর কীর্তনখোলা নদীর ওপর একটি আধুনিক রেলসেতু নির্মাণ করে দপদপিয়া, বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালী হয়ে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় গিয়ে শেষ হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। একই সঙ্গে পায়রা বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা সেতুর পর দক্ষিণাঞ্চলের জন্য এটি হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি।

কিন্তু প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রিতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছেন সম্ভাব্য জমি অধিগ্রহণ এলাকার সাধারণ মানুষ। বরিশাল মহানগরীর টিয়াখালী ও দক্ষিণ সাগরদী এলাকার হাজারো পরিবার বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় আট বছর আগে রেলওয়ের কর্মকর্তারা তাদের বাড়ি ও জমিতে লাল রঙ দিয়ে নম্বর লিখে যান। এরপর থেকে মৌখিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, এসব জমিতে কোনো নতুন স্থাপনা নির্মাণ, সংস্কার কিংবা বিক্রি করা যাবে না। ফলে নিজেদের সম্পত্তির ওপর মালিকানা থাকলেও কার্যত তারা তা ব্যবহার বা হস্তান্তরের অধিকার হারিয়েছেন।

টিয়াখালী এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা সুলতান খান বলেন, “জীবনের শেষ সময়ে সন্তানদের সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে থাকতে চাই। কিন্তু বসতভিটাসহ জমি বিক্রি করতে পারছি না। কেউ কিনতেও চায় না, কারণ সবাই জানে এই জমি রেল প্রকল্পের আওতায় পড়েছে।” একই এলাকার গৃহিণী রাবেয়া বেগম বলেন, “বর্ষা এলেই ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে। কিন্তু রেলের নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থায়ীভাবে সংস্কার করতে পারছি না। বছরের পর বছর কষ্টে বসবাস করছি।” দক্ষিণ সাগরদী এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন জানান, মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে পৈতৃক জমির একটি অংশ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জমিতে লাল নম্বর থাকার কারণে কোনো ক্রেতা আগ্রহ দেখায়নি। পরে বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়ে মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করতে হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৫ হাজার ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো রেলপথে ১৯টি রেলস্টেশন এবং একটি জংশন স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, মুদ্রাস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়ক্ষেপণের কারণে প্রকল্পটির চূড়ান্ত ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

সরকারি বরিশাল হাতেম আলী কলেজের অধ্যক্ষ ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন, “যেকোনো মেগা প্রকল্প দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে তার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে নির্মাণসামগ্রী ও ভূমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, “পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বছরের পর বছর মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেওয়া হয়েছে। যদি দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব না হয়, তাহলে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে অথবা জমির ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০২২ সালে শুরু হয়ে ২০২৯ সালে শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এখনো অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পটির দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি শুরু করা যায়নি। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, “প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি মেগা প্রকল্প। বর্তমানে অর্থসংকটের কারণে বাস্তবায়ন পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উন্নয়ন সহযোগী বা বড় ধরনের অর্থায়ন নিশ্চিত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার এই রেলপথ এখন অর্থায়নের অপেক্ষায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাঙা-বরিশাল-কুয়াকাটা রেলপথ শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু অর্থসংকট দ্রুত কাটিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া না হলে একদিকে যেমন উন্নয়নের স্বপ্ন আরও দীর্ঘদিন অপূর্ণ থেকে যাবে, অন্যদিকে জমি অধিগ্রহণের অনিশ্চয়তায় আটকে থাকা হাজারো পরিবারের দুর্ভোগও আরও দীর্ঘায়িত হবে। তাই দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করে প্রকল্প বাস্তবায়ন অথবা ক্ষতিগ্রস্তদের স্বার্থে জমির ওপর আরোপিত দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চলন্ত গাড়িতে দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে যাত্রাবাড়ী

1

বৃষ্টির ঢাকায় ভোগান্তির নগরজীবন, যানজটে থমকে আছে রাজধানী

2

সংসদ সদস্য আবুল হোসেন খানের হোয়াটসঅ্যাপ একাউন্ট হ্যাক

3

ব্যারিস্টার সোহরাব খান চৌধুরীর সম্ভাব্য পদযাত্রা নিয়ে জনমত

4

পায়েলকে স্যালুট দেওয়া উচিত’

5

আবাসন খাতের সমস্যা সমাধানে রাজউক-রিহ্যাব উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক

6

সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক হস্তক্ষেপ ও দু

7

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মান

8

বাকেরগঞ্জে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

9

বাকেরগঞ্জে মাদকবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত

10

দেড় থেকে দুই কোটি মানুষকে টিসিবির পণ্য দেওয়া সম্ভব: বাণিজ্য

11

আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব

12

বাকেরগঞ্জ পৌরবাসীর ভাগ্য উন্নয়নে স্বপ্নের হাতছানি দিচ্ছেন হ

13

স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন “গর্বের বাকেরগঞ্জ”এর কেন্দ্রীয় কম

14

দ্রুত ইরান ছাড়ার নির্দেশ মার্কিন নাগরিকদের, নিরাপত্তা সতর্কত

15

স্পীকারের কার্যালয়ে শপথ নিলেন দুই নবনির্বাচিত এমপি

16

শবে কদর: রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের রাত-ফেরেশতাদের অবতরণ ও তাক

17

বাকেরগঞ্জে রঙ্গশ্রী-৮নং ওয়ার্ড বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের

18

খারাপ সময়ে বুঝেছি কে আপন, কে পর : নুসরাত ফারিয়া

19

বাকেরগঞ্জে ছাত্রদল নেতা ফাহাদকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় মানববন্ধন

20