মো. শাহজাহান বাশার
গত এক মাস ধরে যশোরে জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় প্রতিদিনই পেট্রোল পাম্পের সামনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ লাইন। বৃহস্পতিবার ভোর ৭টা থেকেই শহরের প্রায় প্রতিটি পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের সারি দেখা যায়। পাম্প খোলার আগেই শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন। কারো গন্তব্য অফিস, কারো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কেউবা জরুরি কাজে বের হয়েছেন—কিন্তু সবার পথ এসে আটকে গেছে পাম্পের লোহার গেটে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর। প্রখর রোদের তাপের পর হঠাৎ করেই শুরু হয় ভারী বর্ষণ। সাধারণ দিনে এমন বৃষ্টি মানুষকে আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে বাধ্য করলেও আজ চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। লাইনে নিজের অবস্থান হারানোর আশঙ্কায় কেউ এক ইঞ্চিও সরে দাঁড়াননি। শত শত মানুষ বাইক ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে। কারো মাথায় পলিথিন, কেউবা ছাতা ছাড়াই ভিজতে ভিজতে অপেক্ষায়। বৃষ্টিতে কাঁপতে থাকা মানুষের এই নীরব মিছিল যেন বলে দিচ্ছে—এক লিটার তেল আজ বেঁচে থাকার সংগ্রামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়সী চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকাল থেকে না খেয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এখন বৃষ্টিতে শরীর ভিজে একাকার। লাইন ছেড়ে আশ্রয় নিতে গেলে যদি তেল শেষ হয়ে যায়? এই কষ্টের বিচার কে করবে?”
আরেকজন তরুণ মোটরসাইকেলচালক জানান, “প্রতিদিন এমন পরিস্থিতি হচ্ছে। অফিসে দেরি হচ্ছে, কাজের ক্ষতি হচ্ছে। অথচ কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।”
এদিকে সরবরাহ কম থাকায় পাম্পগুলোতে সীমিত পরিমাণ তেল বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই শেষ পর্যন্ত তেল না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন। পাম্পকর্মীদের সঙ্গে মাঝে মধ্যেই বাকবিতণ্ডা ও ছোটখাটো উত্তেজনার ঘটনাও ঘটছে। বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও মানুষ কেবল একটুখানি আশায় অপেক্ষা করছেন—যদি আজ অন্তত ট্যাংকে কিছুটা জ্বালানি মেলে।
মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে। এটি এখন আর শুধু ভোগান্তি নয়—বরং এক চরম অমানবিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
যশোরের রাজপথে আজ বৃষ্টি আর তেলের লাইনের যে অদ্ভুত সহাবস্থান দেখা গেল, তা কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়; এটি নিছক বেঁচে থাকার লড়াই। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ভেজা শরীরগুলোর জমে থাকা ক্ষোভ যে বিস্ফোরণে রূপ নেবে না—তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কেউই।
মন্তব্য করুন