স্টাফ রিপোর্টার | কুমিল্লা
কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আবারও নতুন মোড় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও রহস্যাবৃত এই মামলার তদন্তে এবার আরও একজন অজ্ঞাত পুরুষের রক্তের আলামত পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত ব্যুরো (পিবিআই)। এর ফলে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্তে নতুন করে গতি এসেছে বলে দাবি করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
পিবিআই ঢাকা কার্যালয়ের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগে তনুর পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনার ডিএনএ পরীক্ষায় তিনজন ভিন্ন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। নতুন পরীক্ষায় আরও একজন পুরুষের রক্তের আলামত শনাক্ত হয়েছে বলে ডিএনএ ল্যাব থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আগে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর তথ্য ছিল। এখন নতুন করে আরও একজন পুরুষের রক্তের আলামত পাওয়া গেছে। ফলে তদন্তে নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে।”
সিআইডির ডিএনএ ল্যাবরেটরির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ২৪টি আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল তনুর পোশাক, অন্তর্বাস, ভ্যাজাইনাল সোয়াব, দাঁতসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডিএনএ নমুনা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তনুর ওড়না, সালোয়ার ও অন্তর্বাসে একাধিক স্থানে বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয় এবং এসব আলামত থেকে তিনজন ভিন্ন পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। এছাড়া একটি কাপড়ের টুকরোতে রক্তের উপস্থিতি শনাক্ত হয়, যেখানে একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। তবে ওই রক্তের ডিএনএ প্রোফাইলটি পূর্বে শনাক্ত হওয়া তিনজন পুরুষের ডিএনএ’র সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পিবিআই জানিয়েছে, নতুন করে পাওয়া রক্তের আলামত মামলার তদন্তকে আরও জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আরও নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা চলছে। তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, “মামলার তদন্তে অগ্রগতি হচ্ছে। নতুন আলামত পাওয়ায় এখন আরও কয়েকজনের ডিএনএ ক্রস-ম্যাচ করতে হবে। তবে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহিনুল আলমের নাম উঠে আসে। এর মধ্যে হাফিজুর রহমানকে ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে আটক করা হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং কুমিল্লার আদালতে হাজির করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের পাশের একটি জঙ্গলে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর থানা পুলিশ, ডিবি এবং সিআইডি দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও কোনো চূড়ান্ত রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। ২০১৭ সালে প্রথমবার সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় তিনজন পুরুষের বীর্যের উপস্থিতির তথ্য সামনে আসে, যা তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে মামলার নথি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং এরপর থেকে পিবিআই ধারাবাহিকভাবে তদন্ত চালিয়ে আসছে।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে নতুন ডিএনএ প্রমাণকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে এখনো চূড়ান্তভাবে হত্যার রহস্য উন্মোচন হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন ডিএনএ তথ্য বিশ্লেষণ করে শিগগিরই আরও সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং মামলাটির তদন্ত এখন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও তদারকি করা হচ্ছে।
তনু হত্যা মামলা আবারও নতুন তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনায় এসেছে। তবে বহু বছরের পুরোনো এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান কবে মিলবে—সে প্রশ্নই এখন সবার সামনে বড় হয়ে উঠছে।
মন্তব্য করুন